ঢাকা ১১:৪৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

অসাধারণ পারফরম্যান্সে অনবদ্য যুক্তরাষ্ট্র

স্পোর্টস ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৯:৪৭:২৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৭ জুন ২০২৪ ১০ বার পড়া হয়েছে
ডেইলি আর্থ অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশকে হারিয়ে বিশ্বকাপ প্রস্তুতি সেরে নেওয়া যুক্তরাষ্ট্র এবার পাকিস্তানকে বিশ্বকাপ মঞ্চে মাটিতে নামিয়ে তাক লাগিয়ে দিল। গেল আসরের রানার্সআপ পাকিস্তানকে সুপার ওভারে হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কানাডার পর পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়ের মধ্য দিয়ে স্বাগতিকরা মুগ্ধ করেছে সবাইকে। ব্যাট-বলের অসাধারণ লড়াইয়ের সঙ্গে দৃঢ়চেতা মনোবল আর হার না মানা মানসিকতায় যুক্তরাষ্ট্র অনবদ্য, অনন্য, অসাধারণ।

ডালাসে পাকিস্তানের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচে চরম রোমাঞ্চ ছড়ায়। পাকিস্তানকে মাত্র ১৫৯ রানে আটকে রেখে জয়ের প্রাথমিক কাজ করে রেখেছিল তারা। ব্যাটিংয়েও দারুণ জবাব দেয় যুক্তরাষ্ট্র। একটা সময়ে মনে হচ্ছিল জয়টা সহজেই চলে আসবে। কিন্তু পাকিস্তান শেষ দিকে ম্যাচে ফিরে যুক্তরাষ্ট্রকে চেপে ধরে। আফ্রিদি, হারিস ও আমিরের তোপে দিশেহারা হয়ে পড়েন তারা। কিন্তু আশা না ছেড়ে লড়াই করা যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত ম্যাচ টাই করে। শেষ ওভারে মিলিয়ে ফেলে ১৫ রানের সমীকরণ। তাতে ম্যাচ গড়ায় সুপার ওভারে।

সেখানে আগে ব্যাটিং করে যুক্তরাষ্ট্র ১ উইকেটে ১৮ রান করে। পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালালেও ১৩ রানের বেশি করতে পারেনি। ৫ রানের জয়ে বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো তারা আইসিসির পূর্ণ সদস্য দলকে হারানোর স্বাদ পেল। অন্যদিকে সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তান এই ফরম্যাটে প্রথমবার হারল আইসিসির সহযোগী দেশের বিপক্ষে।

সুপার ওভারে বল হাতে আমির ছিলেন ভরসা। কিন্তু তালগোল তিনিই পাকান। ওভারের প্রথম বলেই বাউন্ডারি হজম করেন। পরে অবশ্য দারুণভাবে ফিরে আসলেও তিন ওয়াইড ও চার বাই রান, সিঙ্গেল ও ডাবলসে ১৮ রান খরচ করেন। প্রথম বলে বাউন্ডারির পর বাকি পাঁচ বলে কোনো বাউন্ডারি আসেনি। তারপরও রান ১৮! মাত্র ১০ রান আসে ব্যাট থেকে। বাকিটা অতিরিক্ত।

১৯ রান তাড়ায় পাকিস্তানের শুরুটা হয়েছিল ডট দিয়ে। পরের বলে ইফতেখার বাউন্ডারি আদায় করে নেন। পরের বল ছিল ওয়াইড। বৈধ তৃতীয় বলে ইফতেখারকে ড্রেসিংরুমের পথ দেখান পেসার নেত্রাভালকার। জয়ের জন্য শেষ ৩ বলে দরকার ছিল ১৪ রান। পরের বল আবার ওয়াইড। চতুর্থ বলে শাদাবের ব্যাটের নিচে দিয়ে বল চলে যায় বাউন্ডারিতে। পঞ্চম বলে ২ রান আসলে যুক্তরাষ্ট্রের জয় প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়। কারণ শেষ বলে ছক্কা হলে আবার ম্যাচ টাই। কিন্তু নেত্রভালকারের ওয়াইয়ড ইয়ার্কার থেকে ১ রানের বেশি আদায় করতে পারেননি শাদাব। বল ফিল্ডারের হাতে যাওয়ার আগেই গ্যালারি ফেটে পড়ে। উল্লাসে মিলিয়ে যায় খেলোয়াড়রাও। বলার অপেক্ষা রাখে না, বৈশ্বিক মঞ্চে পাকিস্তানকে হারানো তাদের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা সাফল্যই হয়ে থাকবে।

লক্ষ্য তাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামনে ছিল চার দ্রুত গতির বোলার। আমির, আফ্রিদি, নাসিম ও হারিস রউফ। কিন্তু দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান তাদের বিরুদ্ধে ব্যাটিংয়ে কোনো জড়তাই দেখাননি। দ্রুত গতিতে রান তুলতে পারেননি। কিন্তু জমাট ব্যাটিংয়ে উইকেট আগলে রেখে এগিয়ে গেছেন। বাজে বল শাসন করেছেন। ভালো বল সমীহ করেছেন। সুযোগ বুঝে সিঙ্গেল-ডাবলসে এগিযে নিয়েছেন স্কোর।

পাওয়ার প্লে’র শেষ ওভারে নাসিম শাহ এই জুটি ভাঙেন। বাঁহাতি ওপেনার টেইলর তার লেন্থ বলে খোঁচা দিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন। দ্বিতীয় উইকেটে জয়ের ভিত পেয়ে যায় স্বাগতিকরা। তিনে নামা গিউসকে নিয়ে ৬৮ রানের জুটি গড়েন অধিনায়ক মোনাঙ্ক। বল লেগেছিল ৪৮টি। এ সময়ে দুই ব্যাটসম্যানই প্রতি আক্রমণে গিয়ে রান তুলেছেন।

মোনাঙ্ক আফ্রিদিকে মাথার ওপর দিয়ে ছক্কা মেরে তুলে নেন ফিফটি। ৩৪ বলে ৭ চার ও ১ ছক্কায় পাওয়া ফিফটি পাকিস্তানের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে উঠে। পাকিস্তানের ম্যাচে ফেরার জন্য এই জুটি ও বিশেষ করে মোনাঙ্ককে ফেরানোর দরকার ছিল। পরপর দুই ওভারে হারিস ও আমির দলের হয়ে সেই কাজটা করেন। হারিসের ভেতরে ঢোকানো বলে বোল্ড হন গিউস (২৬ বলে ৩৫)। আমিরের বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন মোনাঙ্ক। ফিফটির পর স্কোরবোর্ডে কোনো রান যোগ করতে পারেননি যুক্তরাষ্ট্রের অধিনায়ক। পরপর দুই ওভারে দুই উইকেট হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্র চাপে পড়ে। পাকিস্তানের পেসারদের সাঁড়াশি আক্রমণে নতুন ব্যাটসম্যানদের দিতে হয় কঠিন পরীক্ষা। তাতে ডট বলের সংখ্যা বাড়ছিল। বাড়ছিল আসকিং রান রেট।

শেষ ৩০ বলে ৪৫ রান দরকার ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। আগের ম্যাচে কানাডার বিপক্ষে ১০ ছক্কায় অপরাজিত ৯৪ রান করা জোন্স থাকায় আশা বেঁচে ছিল তাদের। হতাশ করেননি ডানহাতি ব্যাটসম্যান। শাদাব খানের ষোলোতম ওভারে মাঠের সবচেয়ে বড় সীমানাতে আদায় করে নেয় ছক্কা। তাতে ব্যবধান কিছুটা কমে আসে, ২৪ বলে ৩৪। নাসিম শাহর ওভার থেকে কোনো বাউন্ডারি না পেলেও ৬ বলে ৬ রান তুলে নেয় স্বাগতিকরা। শেষ ১৮ বলে সমীকরণ ২৮ রান। আফ্রিদি পরের ওভারের দ্বিতীয় বলে চার হজম করলেও ৭ রানের বেশি দেয়নি।

শেষ ১২ বলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন ২১ রান। এবার পাকিস্তান কিছুটা আশার আলো দেখে। আমির ১৯তম ওভারে বোলিংয়ে এসে তাদের জয়ের পালে হাওয়া দেন। মাত্র ৬ রান দিয়ে হিসেব পাল্টে দেন। তাতে শেষ ৬ বলে সমীকরণ নেমে আসে ১৫ রানে। যুক্তরাষ্ট্র হাল ছাড়েনি। প্রথম ৩ বলে ৩ রানের পর চতুর্থ বলে ছক্কা হাঁকান জোন্স। শেষ ২ বলে এখন দরকার ৬ রান। পরের বলে ১ রান পেলে ব্যাটিংয়ে আসেন নিতিশ কুমার। শেষ বলে ৫ রানের দরকার হলেও নিতিশ চার হাঁকালে ম্যাচ যায় সুপার ওভারে। বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সুপার ওভার।

এর আগে টস হেরে ব্যাটিং করতে নেমে পাকিস্তান কিছু বুঝে উঠার আগেই তাদের তিন ব্যাটসম্যান ড্রেসিংরুমে। শুরুটা রিজওয়ানকে দিয়ে। বাঁহাতি পেসার সৌরভ নেত্রাভালকারের ভেতরে ঢোকানো বলে ব্যাট সরাতে পারেননি রিজওয়ান। তার ব্যাটের চুমু খেয়ে বল যায় স্লিপে। ওখানে ডানদিকে ঝাঁপিয়ে টেইলর নেন দুর্দান্ত ক্যাচ। নতুন ব্যাটসম্যান উসমান খান বাঁহাতি স্পিনার নশতুশ কেনজিগের বলে ডাউন দ্য উইকেটে এসে বল উড়াতে গিয়ে লং অনে ধরা পড়েন। এক ছক্কায় ভালো শুরুর ইঙ্গিত দেওয়া ফখর জামান পেসার আলী খানের বলে ক্যাচ দেন শর্ট ফাইন লেগে।

দলের এমন বিপর্যয়ে রান তোলা পাকিস্তানের জন্য ছিল দুরূহ ব্যাপার। উইকেটে টিকে থাকা যেখানে কঠিন সেখানে রান তোলার ভাবনা কঠিন। দুই ব্যাটসম্যান শাদাব খান ও বাবর আজম উদ্যোগ নেন ইনিংস মেরামতের। ৬ ওভারে তাদের রান কেবল ৩০। দুজনই শুরুতে সময় নিয়েছিলেন। থিতু হয়েছেন। এরপর আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে রান তোলেন। ৬-১০ এই চার ওভারে পাকিস্তান পায় ৩৬ রান। দশম ওভারেই আসে ১০ রান। পেসার জাসদ্বীপের শুরুর দুই বলে দুই ছক্কা উড়ান শাহাব। ওভারের শেষ বলে বাবর পান বাউন্ডারি।

তাদের ব্যাটের ধারে পরে দ্রুতই রান পাচ্ছিল পাকিস্তান। কিন্তু শতরানের আগে আরো একবার হোঁচট খায় তারা। দৌড়ে দুই রান নিতে গিয়ে শাহাবের পায়ে টান পড়ে। ওখানে খানিকটা বিরতি পান তিনি। কিন্তু ছন্দ হারান ওই বিরতিতে। পরের বল উড়াতে গিয়ে শর্ট ফাইন লেগে ক্যাচ দেন ৪০ রানে। ২৫ বলে ইনিংসটি সাজাতে ৩ ছক্কা ও ১ চার হাঁকান। ওখানে ভাঙে বাবর ও শাদাবের ৪৮ বলে ৬২ রানের জুটি। উইকেটে আসা আজম খান ফেরেন প্রথম বলে। উল্টো রিভিউ নষ্ট করেন।

বাবরের ওপর তখন দায়িত্ব আরো বেড়ে যায়। ইফতেখারকে নিয়ে নতুন করে লড়াই শুরু করেন। কিন্তু ১৮ বলে থেমে যায় তাদের জুটি। এ সময়ে ২৭ রান যোগ হয়। পেসার জোসেফের বলে পাকিস্তানের অধিনায়ক এলবিডব্লিউ হন ৪৪ রানে। শুরুর ২০ রান করতে ২৯ বল খেলা বাবর পরের ২৪ রান করেন ১৪ বলে। সেখান থেকে পাকিস্তানের ইনিংস খুব একটা বড় হয়নি। ইফতেখার ১৪ বলে ১৮ রানের বেশি করতে পারেননি। আফ্রিদির অবদান ছিল দারুণ। ১৬ বলে ২৩ রান করেন ২ ছক্কা ও ১ চারে। তাতে কিছুটা মান বাঁচে পাকিস্তানের। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের দুর্দান্ত বোলিংয়ে তাদের ইনিংসটি ছিল গড়পড়তারও চেয়ে নিচে।

বোলিংয়ে ‍যুক্তরাষ্ট্রের সেরা নশতুশ কেনজিগে। ৩০ রানে ৩ উইকেট নেন। ২ উইকেট নেন পেসার সৌরভ নেত্রাভালকার। ম্যাচটা হেরে পাকিস্তান বড় পিছিয়ে পড়ল। সামনে তাদের প্রতিপক্ষ ভারত। ৯ জুনের ম্যাচটায় তাদের আরো অগ্নিপরীক্ষা দিতে হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

অসাধারণ পারফরম্যান্সে অনবদ্য যুক্তরাষ্ট্র

আপডেট সময় : ০৯:৪৭:২৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৭ জুন ২০২৪

বাংলাদেশকে হারিয়ে বিশ্বকাপ প্রস্তুতি সেরে নেওয়া যুক্তরাষ্ট্র এবার পাকিস্তানকে বিশ্বকাপ মঞ্চে মাটিতে নামিয়ে তাক লাগিয়ে দিল। গেল আসরের রানার্সআপ পাকিস্তানকে সুপার ওভারে হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কানাডার পর পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়ের মধ্য দিয়ে স্বাগতিকরা মুগ্ধ করেছে সবাইকে। ব্যাট-বলের অসাধারণ লড়াইয়ের সঙ্গে দৃঢ়চেতা মনোবল আর হার না মানা মানসিকতায় যুক্তরাষ্ট্র অনবদ্য, অনন্য, অসাধারণ।

ডালাসে পাকিস্তানের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচে চরম রোমাঞ্চ ছড়ায়। পাকিস্তানকে মাত্র ১৫৯ রানে আটকে রেখে জয়ের প্রাথমিক কাজ করে রেখেছিল তারা। ব্যাটিংয়েও দারুণ জবাব দেয় যুক্তরাষ্ট্র। একটা সময়ে মনে হচ্ছিল জয়টা সহজেই চলে আসবে। কিন্তু পাকিস্তান শেষ দিকে ম্যাচে ফিরে যুক্তরাষ্ট্রকে চেপে ধরে। আফ্রিদি, হারিস ও আমিরের তোপে দিশেহারা হয়ে পড়েন তারা। কিন্তু আশা না ছেড়ে লড়াই করা যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত ম্যাচ টাই করে। শেষ ওভারে মিলিয়ে ফেলে ১৫ রানের সমীকরণ। তাতে ম্যাচ গড়ায় সুপার ওভারে।

সেখানে আগে ব্যাটিং করে যুক্তরাষ্ট্র ১ উইকেটে ১৮ রান করে। পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালালেও ১৩ রানের বেশি করতে পারেনি। ৫ রানের জয়ে বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো তারা আইসিসির পূর্ণ সদস্য দলকে হারানোর স্বাদ পেল। অন্যদিকে সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তান এই ফরম্যাটে প্রথমবার হারল আইসিসির সহযোগী দেশের বিপক্ষে।

সুপার ওভারে বল হাতে আমির ছিলেন ভরসা। কিন্তু তালগোল তিনিই পাকান। ওভারের প্রথম বলেই বাউন্ডারি হজম করেন। পরে অবশ্য দারুণভাবে ফিরে আসলেও তিন ওয়াইড ও চার বাই রান, সিঙ্গেল ও ডাবলসে ১৮ রান খরচ করেন। প্রথম বলে বাউন্ডারির পর বাকি পাঁচ বলে কোনো বাউন্ডারি আসেনি। তারপরও রান ১৮! মাত্র ১০ রান আসে ব্যাট থেকে। বাকিটা অতিরিক্ত।

১৯ রান তাড়ায় পাকিস্তানের শুরুটা হয়েছিল ডট দিয়ে। পরের বলে ইফতেখার বাউন্ডারি আদায় করে নেন। পরের বল ছিল ওয়াইড। বৈধ তৃতীয় বলে ইফতেখারকে ড্রেসিংরুমের পথ দেখান পেসার নেত্রাভালকার। জয়ের জন্য শেষ ৩ বলে দরকার ছিল ১৪ রান। পরের বল আবার ওয়াইড। চতুর্থ বলে শাদাবের ব্যাটের নিচে দিয়ে বল চলে যায় বাউন্ডারিতে। পঞ্চম বলে ২ রান আসলে যুক্তরাষ্ট্রের জয় প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়। কারণ শেষ বলে ছক্কা হলে আবার ম্যাচ টাই। কিন্তু নেত্রভালকারের ওয়াইয়ড ইয়ার্কার থেকে ১ রানের বেশি আদায় করতে পারেননি শাদাব। বল ফিল্ডারের হাতে যাওয়ার আগেই গ্যালারি ফেটে পড়ে। উল্লাসে মিলিয়ে যায় খেলোয়াড়রাও। বলার অপেক্ষা রাখে না, বৈশ্বিক মঞ্চে পাকিস্তানকে হারানো তাদের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা সাফল্যই হয়ে থাকবে।

লক্ষ্য তাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামনে ছিল চার দ্রুত গতির বোলার। আমির, আফ্রিদি, নাসিম ও হারিস রউফ। কিন্তু দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান তাদের বিরুদ্ধে ব্যাটিংয়ে কোনো জড়তাই দেখাননি। দ্রুত গতিতে রান তুলতে পারেননি। কিন্তু জমাট ব্যাটিংয়ে উইকেট আগলে রেখে এগিয়ে গেছেন। বাজে বল শাসন করেছেন। ভালো বল সমীহ করেছেন। সুযোগ বুঝে সিঙ্গেল-ডাবলসে এগিযে নিয়েছেন স্কোর।

পাওয়ার প্লে’র শেষ ওভারে নাসিম শাহ এই জুটি ভাঙেন। বাঁহাতি ওপেনার টেইলর তার লেন্থ বলে খোঁচা দিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন। দ্বিতীয় উইকেটে জয়ের ভিত পেয়ে যায় স্বাগতিকরা। তিনে নামা গিউসকে নিয়ে ৬৮ রানের জুটি গড়েন অধিনায়ক মোনাঙ্ক। বল লেগেছিল ৪৮টি। এ সময়ে দুই ব্যাটসম্যানই প্রতি আক্রমণে গিয়ে রান তুলেছেন।

মোনাঙ্ক আফ্রিদিকে মাথার ওপর দিয়ে ছক্কা মেরে তুলে নেন ফিফটি। ৩৪ বলে ৭ চার ও ১ ছক্কায় পাওয়া ফিফটি পাকিস্তানের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে উঠে। পাকিস্তানের ম্যাচে ফেরার জন্য এই জুটি ও বিশেষ করে মোনাঙ্ককে ফেরানোর দরকার ছিল। পরপর দুই ওভারে হারিস ও আমির দলের হয়ে সেই কাজটা করেন। হারিসের ভেতরে ঢোকানো বলে বোল্ড হন গিউস (২৬ বলে ৩৫)। আমিরের বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন মোনাঙ্ক। ফিফটির পর স্কোরবোর্ডে কোনো রান যোগ করতে পারেননি যুক্তরাষ্ট্রের অধিনায়ক। পরপর দুই ওভারে দুই উইকেট হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্র চাপে পড়ে। পাকিস্তানের পেসারদের সাঁড়াশি আক্রমণে নতুন ব্যাটসম্যানদের দিতে হয় কঠিন পরীক্ষা। তাতে ডট বলের সংখ্যা বাড়ছিল। বাড়ছিল আসকিং রান রেট।

শেষ ৩০ বলে ৪৫ রান দরকার ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। আগের ম্যাচে কানাডার বিপক্ষে ১০ ছক্কায় অপরাজিত ৯৪ রান করা জোন্স থাকায় আশা বেঁচে ছিল তাদের। হতাশ করেননি ডানহাতি ব্যাটসম্যান। শাদাব খানের ষোলোতম ওভারে মাঠের সবচেয়ে বড় সীমানাতে আদায় করে নেয় ছক্কা। তাতে ব্যবধান কিছুটা কমে আসে, ২৪ বলে ৩৪। নাসিম শাহর ওভার থেকে কোনো বাউন্ডারি না পেলেও ৬ বলে ৬ রান তুলে নেয় স্বাগতিকরা। শেষ ১৮ বলে সমীকরণ ২৮ রান। আফ্রিদি পরের ওভারের দ্বিতীয় বলে চার হজম করলেও ৭ রানের বেশি দেয়নি।

শেষ ১২ বলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন ২১ রান। এবার পাকিস্তান কিছুটা আশার আলো দেখে। আমির ১৯তম ওভারে বোলিংয়ে এসে তাদের জয়ের পালে হাওয়া দেন। মাত্র ৬ রান দিয়ে হিসেব পাল্টে দেন। তাতে শেষ ৬ বলে সমীকরণ নেমে আসে ১৫ রানে। যুক্তরাষ্ট্র হাল ছাড়েনি। প্রথম ৩ বলে ৩ রানের পর চতুর্থ বলে ছক্কা হাঁকান জোন্স। শেষ ২ বলে এখন দরকার ৬ রান। পরের বলে ১ রান পেলে ব্যাটিংয়ে আসেন নিতিশ কুমার। শেষ বলে ৫ রানের দরকার হলেও নিতিশ চার হাঁকালে ম্যাচ যায় সুপার ওভারে। বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সুপার ওভার।

এর আগে টস হেরে ব্যাটিং করতে নেমে পাকিস্তান কিছু বুঝে উঠার আগেই তাদের তিন ব্যাটসম্যান ড্রেসিংরুমে। শুরুটা রিজওয়ানকে দিয়ে। বাঁহাতি পেসার সৌরভ নেত্রাভালকারের ভেতরে ঢোকানো বলে ব্যাট সরাতে পারেননি রিজওয়ান। তার ব্যাটের চুমু খেয়ে বল যায় স্লিপে। ওখানে ডানদিকে ঝাঁপিয়ে টেইলর নেন দুর্দান্ত ক্যাচ। নতুন ব্যাটসম্যান উসমান খান বাঁহাতি স্পিনার নশতুশ কেনজিগের বলে ডাউন দ্য উইকেটে এসে বল উড়াতে গিয়ে লং অনে ধরা পড়েন। এক ছক্কায় ভালো শুরুর ইঙ্গিত দেওয়া ফখর জামান পেসার আলী খানের বলে ক্যাচ দেন শর্ট ফাইন লেগে।

দলের এমন বিপর্যয়ে রান তোলা পাকিস্তানের জন্য ছিল দুরূহ ব্যাপার। উইকেটে টিকে থাকা যেখানে কঠিন সেখানে রান তোলার ভাবনা কঠিন। দুই ব্যাটসম্যান শাদাব খান ও বাবর আজম উদ্যোগ নেন ইনিংস মেরামতের। ৬ ওভারে তাদের রান কেবল ৩০। দুজনই শুরুতে সময় নিয়েছিলেন। থিতু হয়েছেন। এরপর আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে রান তোলেন। ৬-১০ এই চার ওভারে পাকিস্তান পায় ৩৬ রান। দশম ওভারেই আসে ১০ রান। পেসার জাসদ্বীপের শুরুর দুই বলে দুই ছক্কা উড়ান শাহাব। ওভারের শেষ বলে বাবর পান বাউন্ডারি।

তাদের ব্যাটের ধারে পরে দ্রুতই রান পাচ্ছিল পাকিস্তান। কিন্তু শতরানের আগে আরো একবার হোঁচট খায় তারা। দৌড়ে দুই রান নিতে গিয়ে শাহাবের পায়ে টান পড়ে। ওখানে খানিকটা বিরতি পান তিনি। কিন্তু ছন্দ হারান ওই বিরতিতে। পরের বল উড়াতে গিয়ে শর্ট ফাইন লেগে ক্যাচ দেন ৪০ রানে। ২৫ বলে ইনিংসটি সাজাতে ৩ ছক্কা ও ১ চার হাঁকান। ওখানে ভাঙে বাবর ও শাদাবের ৪৮ বলে ৬২ রানের জুটি। উইকেটে আসা আজম খান ফেরেন প্রথম বলে। উল্টো রিভিউ নষ্ট করেন।

বাবরের ওপর তখন দায়িত্ব আরো বেড়ে যায়। ইফতেখারকে নিয়ে নতুন করে লড়াই শুরু করেন। কিন্তু ১৮ বলে থেমে যায় তাদের জুটি। এ সময়ে ২৭ রান যোগ হয়। পেসার জোসেফের বলে পাকিস্তানের অধিনায়ক এলবিডব্লিউ হন ৪৪ রানে। শুরুর ২০ রান করতে ২৯ বল খেলা বাবর পরের ২৪ রান করেন ১৪ বলে। সেখান থেকে পাকিস্তানের ইনিংস খুব একটা বড় হয়নি। ইফতেখার ১৪ বলে ১৮ রানের বেশি করতে পারেননি। আফ্রিদির অবদান ছিল দারুণ। ১৬ বলে ২৩ রান করেন ২ ছক্কা ও ১ চারে। তাতে কিছুটা মান বাঁচে পাকিস্তানের। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের দুর্দান্ত বোলিংয়ে তাদের ইনিংসটি ছিল গড়পড়তারও চেয়ে নিচে।

বোলিংয়ে ‍যুক্তরাষ্ট্রের সেরা নশতুশ কেনজিগে। ৩০ রানে ৩ উইকেট নেন। ২ উইকেট নেন পেসার সৌরভ নেত্রাভালকার। ম্যাচটা হেরে পাকিস্তান বড় পিছিয়ে পড়ল। সামনে তাদের প্রতিপক্ষ ভারত। ৯ জুনের ম্যাচটায় তাদের আরো অগ্নিপরীক্ষা দিতে হবে।